আমাদের দেশে শিম চাষে প্রচুর টাকা খরচ হয় এবং এই চাষে প্রচুর পরিচর্যা করা লাগে। এই শিম চাষের জমিতে বিভিন্ন সার যেমন ফসফেট, পটাশিয়াম, ইউরিয়া ও ইত্যাদি প্রয়োগে এত খরচ ও পরিশ্রম করেও যখন শিম গাছে ফুল আসতে শুরু করে তখন দেখাযাই অনেকের শিম গাছে ফুল আসছে কিন্তু ফুলগুলি ঝরে যাচ্ছে, এই ফুল কোনো ভাবেই শিমের গুটি বা পড তৈরি না হওয়া খুবি হতাশা জনক। এই ব্লগে আমি আপনাদের কে বলতে যাচ্ছি কেন আপনার শিম গাছের ফুলগুলি ঝরে যাচ্ছে এবং এর সমাধান কি ??

শিম চাষের সময় আমাদের বাংলাদেশ ও ভারতে তিনটি কারণে বেশি বেশি ফুল ও ফল ঝরে এই কারণ গুলি নিচে উল্লেখ করা হলো
- অতিরিক্ত বৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত সূর্যের আলো
- অতিরিক্ত তাপমাত্রা
- অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা
- সঠিক জাত নির্বাচন না করা

অতিরিক্ত বৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত সূর্যের আলো :
বর্ষার মৌসুমে বা বিভিন্ন মৌসুমে টানা বেশ কয়েকদিন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, প্রতিনিয়ত বৃষ্টি, অপর্যাপ্ত সূর্যের আলো অথবা সপ্তাহ ধরে মাটি ভেজা থাকলে শিমের ফুল ও ফল ঝরে যায়। শিমের ফুল থেকে গুটি বা পড তৈরির দিনে মিনিমাম ৬-৭ ঘণ্টা পর্যাপ্ত সূর্যের আলো থাকা অনিবার্য। এক কথায় বলা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে এমনটি হয়।
- সমাধান: অতিরিক্ত বৃষ্টি ও অপর্যাপ্ত সূর্যের আলো এইগুলি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এর তেমন কোনো কার্যকর সমাধান হয় না। তবে শিমের ক্ষেতে অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য জমিতে সঠিক পানি নির্গমন ব্যবস্থা করলে জমি থেকে দ্রুত পানি সরে যায় ও শিম গাছ গোড়া পচা ও পাতা হলুদ হওয়া থেকে রক্ষা পায়, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেরিয়ে গেলে আপনার জমিতে স্বাভাবিকভাবে ফুল ঝরা বন্ধ ও ফুল থেকে ফল তৈরি হবে।
অতিরিক্ত গরম ও তাপমাত্রা:
পরিবেশে অতিরিক্ত তাপমাত্রা, খরা ও রোদের কারণে শিম গাছ তাদের শরীরে পানি ধরে রাখার জন্য পত্ররন্ধ্র বন্ধ করে ও সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন হয়। সাধারণত পরিবেশের তাপমাত্রা ১৬-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উপরে গেলে শিমের ফুল ঝরতে শুরু করে।
- সমাধান: কৃষকের যদি মনেহয় কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বেশি পড়বে তাহলে জমিতে সেচ দিতে হবে তাহলে শিমের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া স্বাভাবিক হয় ও জমির কিছুটা তাপমাত্রা কমে। কিন্তু এই অতিরিক্ত তাপমাত্রা বেশি দিন থাকলে জমিতে সেচ দিয়ে ফুল ঝরা রোধ হবে না।
![]()
অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করা:
শিম চাষে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনের উপস্থিতি হলে শিমের ফুল ঝরা শুরু হয়। শিম গাছের পাতা এবং ফুল ও ফলে প্রচুর পোকার আক্রমন হয় এই পোকা দমনে বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক প্রয়োগ জরুরী হয়। শিমে ল্যামডা সাইহ্যালোথ্রিন ও অন্য কিছু কৃত্রিম কীটনাশক অতিরিক্ত মাত্রা ও ডোজ দিয়ে শিমের উপর প্রয়োগ করলে শিমের ফুল ও ফল ঝরে যাওয়া ও শিমের পাতার কিনারা পুড়ে যাওয়া, পাতা লাল হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
সমাধান: জমিতে অতিরিক্ত নাইট্রোজেনের উপস্থিতিতে শিমের ফুল ঝরে যাই, তাই শিম ক্ষেতে অতিরিক্ত পরিমাণে ইউরিয়া সার ব্যবহার বন্ধ করা ও অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ বন্ধ করতে হবে। কীটনাশক ভর দুপুর বা অতিরিক্ত রোদে স্প্রে না করা।
সঠিক জাত নির্বাচন না করা:
বেশি কিছু শিমের জাত আছে যেগুলি গরম ও শিতের মোশুমে ভালো ফলন দেই। আপনি যদি শীতকালী শিমের জাত অগ্রিম ভাবে রোপন করেন তাহলে এটি পর্যাপ্ত আবহাওয়া শীতল না পেলে তার ফুল ঝরে যাবে। বিশেষ করে সাদা শিমের জাত গরমকালীন আবহাওয়াতে ভালো ফুল ও ফল আসে কিন্তু পার্পেল কালার ফুলের পাপড়ি শিমের জাত গুলি পর্যাপ্ত শীতল আবহাওয়া না পেলে ফুল ঝরে যাই।
উপরে অধিকাংশ যেই কারণে শিমের ফুল ঝরে তা উল্লেখ করা হয়েছে, উল্লিখিত এই কারণে বাংলাদেশের অধিকাংশ শিম চাষিদের ফুল ও ফল বেশি ঝরে যাই, ফুল থেকে কোনো মুকুল বা ফল তৈরি হয় না। তবে এই কারণ ছাড়া কয়েকটি ছোট ছোট কারণ আছে যার জন্য অল্প কিছু ফুল ঝরতে পারে তা নিচে উল্লখ করা হলো
ফুল ঝরে যাওয়ার অন্যান্য ছোট ছোট কারণ
নিচে যেই কারণ গুলি উল্লেখ করা হলো এই কারণে ফুল ঝরার সম্ভাবনা আমাদের দেশের মাটিতে খুবি কম তবুও তা নিচে উল্লেখ করা হলো
- নতুন গাছের ফুল ঝরা: নতুন রোপণ কৃত শিম চাষের শুরুতে প্রথম দিকে শিমের যে ফুলগুলো আসে, এগুলি স্বাভাবিকভাবে অনেকটা ঝরে এটা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এছাড়াও অনেক দিনধরে ফল দেওয়ার পর শিমগাছ বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নিজেই ফুল ঝরাতে পারে।
- পরাগায়নের অভাব: আমাদের এশিয়া মহাদেশের শিম গাছ গুলি মূলত স্ব পরাগায়ন গুন সম্পন্ন হয়, এই পরাগায়ন কতটা কার্যকর হবে এটা পরিবেশের আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে। এই শিম গাছগুলি স্ব-পরাগায়ন হলেও পরিবেশে বিরূপ আবহাওয়া বিরাজমান হলে কিছুটা ফুল ঝরতে পারে তবে পরাগায়নের অভাবে শিম গাছের ফুল ঝরা এই ঘটনা খুবি কম।
- অনুক্ষাদ্য ঘাটতি ও রোগ আক্রান্ত গাছ মাটির বিষাক্ততার: মাটিতে বেশ কিছু অনুখাদ্য যেমনঃ বোরণ আয়রন এই গুলির কারণে ফুল ঝরতে পারে কিন্তু বাংলাদেশের পানি ও মাটিতে আগে থেকে অনেক ক্ষনিজ উপাদান মিনারেল ও অনুক্ষাদ্য বিরাজমান এবং চাষিরা অনেক সময় বিভিন্ন পরিমানে অনুক্ষাদ্য প্রয়োগ করেন এই জন্য আমাদের দেশে অনুক্ষাদ্যর অভাবে ফুল ঝরে পড়া ঘটনা খুবি কম।